শৈশবের গলি থেকে জীবনের মোড়ে
(Part -2 )
এই ঘটনার মাত্র কিছুদিন পর অয়নের বাবার আকস্মিক বদলির চাকরি সূত্রে তাদের পুরো পরিবারকে শহর ছাড়তে হয়। মুম্বাইয়ের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে অয়ন একবার মেঘার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস করে আর দেখা করেনি। মেঘাও জানত না যে অয়ন চিরকালের মতো শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
দিন গড়াল, বছর কাটল। সময়ের স্রোতে শৈশবের সেই গলি, সেই সান্ধ্যকালীন আড্ডা আর পাশাপাশি বাড়ির বারান্দার স্মৃতিগুলো ফিকে হতে শুরু করল। অয়ন নিজেকে পুরোপুরি পড়াশোনা এবং ক্যারিয়ার গড়ার কাজে সঁপে দিল। মেঘাও তার সমস্ত মনোযোগ ঢেলে দিল পড়াশোনায়। অয়ন এখন মুম্বাইয়ের একটি নামী মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির উধ্বতন কর্মকর্তা, আর মেঘা কলকাতার একটি স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রধান বিজ্ঞানী।
কাজের সূত্রে অয়নকে কিছুদিন পর পর কলকাতায় আসতে হতো। এমনই এক শীতের সকালে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র পার্ক স্ট্রিটের একটি বিখ্যাত ক্যাফেতে একটি কর্পোরেট মিটিংয়ের ফাঁকে কফি খেতে ঢুকেছিল অয়ন। ঠিক সেই মুহূর্তে কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল মেঘা, তার সহকর্মীদের সাথে কোনো একটি প্রোজেক্ট নিয়ে আলোচনা করতে করতে।
ক্যাফেটার মৃদু আলোয় প্রথমটায় কেউ কাউকে চিনতে পারেনি। কিন্তু মেঘার সেই চেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বর আর চোখের চশমাটা অয়নের নজরে আসতেই বুকটা এক পলকের জন্য কেঁপে উঠল। আর মেঘা যখন মাথা ঘুরিয়ে দেখল সামনে বসে থাকা সুপরিচিত মুখের মানুষটিকে, তার হাত থেকে কফি কাপটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।
"অয়ন?" মেঘা মৃদুস্বরে ফিসফিস করে উঠল। "কেমন আছিস, মেঘা?" অয়নের কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত প্রাপ্তি আর পুরনো অভিমানের মিশ্রণ।
বসে পড়ার পর প্রথম ১০ মিনিট দুই পক্ষের মধ্যে এক ভারী নীরবতা বজায় রইল। শৈশবের সেই না-বলা কথা, না-বোঝা অনুভূতিগুলো যেন হঠাৎ ভূত হয়ে ঘাড়ের ওপর চেপে বসল।
কয়েক দিন ধরে তাদের মধ্যে পুরোনো সেই দূরত্ব এবং ছোটবেলার ভুল বোঝাবুঝির বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলো। অয়ন জানতে পারল, সেদিন মেঘা কেন অমন কঠোর হয়েছিল—তার মনে কেবল ভয় ছিল দুই পরিবারের সুসম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার। আর মেঘাও বুঝতে পারল, অয়নের অনুভূতি নিছক কোনো ছেলেমানুষি ছিল না, বরং তা ছিল খাঁটি ও পবিত্র।
অতীতের সেই মেঘ কেটে যেতে বেশি সময় লাগল না। দুজনেই বুঝতে পারল, হৃদয়ের গভয়ে সেই শৈশবের ভালোলাগাটা এত বছর ধরে একটুও ম্লান হয়নি, বরং সময়ের পরিপক্বতায় তা আরও পোক্ত হয়েছে।
এক রবিবার দুই পরিবারকে একসঙ্গে এক ডিনারে আমন্ত্রণ জানাল অয়ন ও মেঘা। রায় পরিবার ও দত্ত পরিবার যখন জানতে পারল তাদের ছেলে ও মেয়ে একে অপরকে ভালোবাসে ওরা ও খুব খুশি হল । তাদের শৈশবের সেই মধুর সম্পর্কটা আজ এক পূর্ণতা পেতে চলেছে, তখন খুশিতে দুই পরিবারের অভিভাবকদের চোখে জল চলে এল। কোনো বাধা বা দ্বিধা না রেখে, পুরোনো সব ভুল বোঝাবুঝি মুছে ফেলে দুই পরিবার সানন্দে তাদের এই সম্পর্ককে মেনে নিল।
পরের বসন্তে সেই পুরোনো উত্তরপাড়ার লেনে দুই বাড়ির মাঝের প্রাচীরটা যেন আরও একটু ছোট হয়ে গেল, আর পাশাপাশি দুটি পরিবার নতুন এক সুতায় বাঁধা পড়ল চিরকালের মতো।

0 Comments
Thanks for comments.